পঙ্গপালের নজর পড়েছে পোকখালী মাদ্রাসায় অতঃপর ইসমাইল জবীহ’র বিদায়

0
4356

কাওমি অঙ্গনে এক অদ্ভুত নিয়ম; দেখার কেউ নেই! কেনো নিয়োগের নিয়ম নেই? কেনো বা বরখাস্তের নিয়ম নেই? কেনো সিনিয়রদের সম্মান নেই? কেনো স্বার্থসিদ্ধি না হলে ঢালাও ভাবে ছাটাই প্রক্রিয়া হয়?

পৃথিবীতে যারাই মানুষের কল্যাণের জন্যে নিজের জীবনকে নিবেদিত করে তাদের পেছনে সবসময় একদল পঙ্গপাল লেগেই থাকে; বিশেষকরে এই বঙ্গদেশে। এই বঙ্গদেশের কতিপয় শ্রেণী কিছু কিছু অনিয়মকে নিয়ম মনে করে। এই অনিয়ম-ই নিয়মেই পরিণত হয় কোন কোন স্থানে; বিশেষকরে কওমি মাদরাসায়। কওমি মাদরাসাকে যারা পারিবারিক সম্পত্তি মনে করে, তারাই এই অনিয়মকে নিয়ম মনে করে প্রতিষ্ঠানকে ধবংস করে; বিশেষত একটি জাতিকে স্বপ্নভঙ্গ করে দেয়।

কেনো নিয়োগের নিয়ম নেই? কেনো বা বরখাস্তের নিয়ম নেই? কেনো সিনিয়রদের সম্মান নেই? কেনো স্বার্থসিদ্ধি না হলে ঢালাওভাবে ছাটাই প্রক্রিয়া হয়? কেনো নিজের জীবন যৌবন উৎসর্গকারীদের এক বাক্যে বিদায় দেয়া হয়? উত্তর কোরিয়ার মতো একটি পরিবার যদি প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির প্রতি নজর না দিয়ে একটি পরিবারের লাভ লোকসানের দিককেই প্রাধান্য দেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ কতদিন থাকবে তা সময় বলে দেয়। দুঃখের সাথে বলতে হয়, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান হলো পোকখালী মাদরাসা। কেনো আজ এই মাদরাসার এতো অধঃপতন? কেনো আজ অতীতের সুখবার্তাগুলি বর্তমানে শোকবার্তায় পরিণত হয়? এর দায় কে নেবে? ছাহেবজাদা? ছাহেবজাদা নিয়ম যেদিন হতে প্রবেশ করেছে যে কোন প্রতিষ্ঠানে, সেখানেই অনিয়ম-ই নিয়মের জালে বন্ধি হয়ে গেছে!!

মনে রাখতে হবে ইসমাঈল জবীহ একটি নাম নয় শুধু; বরং তিন একটি প্রতিষ্ঠানও। পোকখালী মাদরাসার একজন সিনিয়র উস্তায। পোকখালী মাদরাসার সুনাম ও প্রচার যাদের মাধ্যমে তিনি-ই তাদের একজন। কারণ একটি মাদরাসা শুধু দালানের নাম নয়; মাদরাসা হলো ছাত্রদের যোগ্য করে তোলারা একটি বাহন মাত্র। সেই বাহনের প্রতিটি কারিগর কিন্তু ছাত্রদের যোগ্য করে তোলার একমাত্র দাবিদার। বিশেষকরে যারা ছাত্রদের ইস্তি’দাদ তথা বাস্তবে যোগ্য করে তোলে তাদের অন্যতম কারিগর হলো ইসমাঈল জবীহ সাহেব।

ইসমাঈল জবীহ মানে যার হাতের লেখা শিখে শত শত ছাত্র ইত্তিহাদুল মাদারিস বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় বৃত্তি অর্জন করেছে। এককালে প্রচলিত ছিলো যে, পোকখালী মাদরাসার ছাত্রদের শুধু ইলমি যোগ্যতা নয়; হাতের লেখা সৌন্দর্যেরও একটি যোগ্যতার কথা বেশ প্রচলিত ছিলো। এই হাতের লেখা শেখানোর ক্ষেত্রে যাদের অবদান চির অনস্বীকার্য তাদের একজন ইসমাঈল জবীহ।

ইসমাঈল জবীহ মানে উর্দু আরবি কবিতার মূর্ত প্রতীক। উর্দু কবিতা ও ছন্দ-জ্ঞানে যার প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়া দুস্কর তিনিই ইসমাঈল জবীহ সাহেব। পোকখালী মাদরাসায় দেশি বিদেশী যে কোন মেহমানের আগমনে যার কবিতা সুর তোলে তিনি-ই ইসমাঈল জবীহ সাহেব। বিনা পরিশ্রমে রাতকে দিন করে যেই শিক্ষক ছাত্রদের ছন্দজ্ঞান শেখাতেন, তিনি-ই আর কেউ নন আমাদের হাস্যরসের হাঁড়িখ্যাত উস্তায ইসমাঈল জবীহ সাহেব।

ইসমাঈল জবীহ যার ক্লাস করানোর ধরন অদ্বিতীয়। তিনিই আরবি ব্যাকরণের কঠিন কঠিন কিতাবাদি সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় ছাত্রদের মনে এঁকে দিতেন। কাফিয়া, শরহে জামি ও জালালাইন ইত্যাদির মতো কিতাব যিনি সহজে বোধগম্য হওয়ার মতো করে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করেন তিনি-ই ইসমাঈল জবীহ সাহেব।

তা’লিমাত তথা শিক্ষা বিষয়ক যে কোন বিজ্ঞপ্তি ও পরিক্ষা সংক্রান্ত কাজ যেই ব্যক্তি নিপুনভাবে আঞ্জাম দিতে জানেন তিনি তো ইসমাঈল জবীহ। বর্তমানে পোকখালী মাদরাসার ছাত্র যারা বিভিন্ন মাদরাসার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও শিক্ষা সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন, তারা সবাই তাঁর সিস্টেমের অনুসারী ও অনুগামী। একটি মানুষের মধ্যে অসংখ্য গুণের সমাগম যে ঘটতে পারে, তাকে না দেখলে বুঝা-ই যায় না।

আজ তিনি…
ইনতেকাল করেন নি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হতে এমন বিদায় কেউ কি আশা করেছিলো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here