মরহুম মাওলানা আবদুর রহীম বুখারী স্মরণে

0
118

অধ্যাপক ড. আ ক ম আব্দুল কাদেরে

আমি আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক প্রফেসর ড. আবু বকর রফিক আহমদ স্যারের একান্ত নির্দেশে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ব্যতীত ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনে চুনতী হাকীমিয়া কামিল মাদ্রাসায় প্রিন্সিপাল পদে যোগদান করি। এ বছর এই মাদ্রাসা থেকে ২৭ জন শিক্ষার্থী কামিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পুরণ করে। এদের মধ্যে কেবল আহমদ আলী বর্তমানে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আমার একান্ত স্নেহভাজন ছাত্র ও শিষ্য প্রফেসর ড. আহমদ আলী পূর্ব থেকেই আমার পরিচিত ছিল। অন্যদের সাথে পরিচয় হয় আমি যোগদানের পর। এই ব্যাচের সবাই ছিল খুবই মেধাবী, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, বিসিএস ক্যাডার, কলেজ- মাদ্রাসায় অধ্যাপনা এবং প্রিন্সিপাল সহ অন্যান্য পদে নিয়োজিত থেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত যোগ্যতা দক্ষতার সাথে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
এক দিন বিকেলে বেলা একজন আমার চাইতেও বয়স্ক লোক আমার ব্যক্তিগত কক্ষে এসে আমার সাথে দেখা করে। পরিচয় দেয়, হুজুর, আমার নাম আবদুর রহীম বুখারী। এই বছর কামিল পরীক্ষার্থী। আমি অন্যান্য ছাত্রের মত তাকে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেই। সে খুবই অনুগত ছাত্র হিসাবে আমার পাঠ গ্রহণ করে। তখনো পর্যন্ত আমি তার আসল পরিচয় জানতে পারি নি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, সাজেশন, উত্তরপত্র লেখার ধরণ ইত্যাদি বিষয়ে আমার ছাত্র জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতার চেষ্টা করি। একদিন মাদ্রাসার অফিসের দায়িত্বে নিয়োজিত জনাব মাওলানা শফাআত আহমদ তাঁর পরিচয় তুলে ধরলেও আমার সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় তথা ছাত্র- শিক্ষকের পরিচয়ই আজীবন মুখ্য ছিল।
পরীক্ষা যথারীতি সম্পন্ন হলো। যথাসময়ে সকলের ফলাফল ঘোষিত হলেও একজনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। আর তিনি হলেন আবদুর রহীম বুখারী। আমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম, এই পরীক্ষার্থীর একটি উত্তরপত্রের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক রিপোর্ট করেছেন যে, এই উত্তরপত্র পরীক্ষার হলে বসে লেখা হয় নি। এটি পরীক্ষার হলের বাইরে থেকে লিখে জমা দেওয়া হয়েছে। মাওলানা আবদুর রহীম বুখারী ছিলেন মূলত একজন কাতেব, যার হাতের লেখা ছিল বই এর ছাপার অক্ষরের মত। আর বিষয়টি আমার জানা ছিল বলে আমি বললাম, এই উত্তরপত্র পরীক্ষার হলে বসেই লেখা হয়েছে। এই ব্যাপারে যেই কোন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আমি প্রস্তুত। আমার দৃঢ় অবস্থান দেখে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহোদয় পরামর্শ দিলেন, যদি প্রধান পরীক্ষক সুপারিশ করেন তা হলে তিনি ফলাফল প্রকাশ করবেন। আমি প্রধান পরীক্ষকের নাম ঠিকানা নিয়ে চট্টগ্রাম চলে আসি এবং পরীক্ষার্থী আবদুর রহীম বুখারীকে সাথে নিয়ে লক্ষীপুর জেলার অন্তর্গত রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল জনাব মাওলানা কামাল উদ্দীন খান সাহেবের নিকট চলে যাই। আবদুর রহীম বুখারী বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি প্রিন্সিপাল সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করে নিজের পরিচয় দিলাম। আমার নামের সাথে তাঁর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তিনি অনেক বড় মাপের আলিম এবং খুবই সজ্জন ব্যক্তি। আমাকে পেয়ে কী করবেন, কী খাওয়াবেন এই বিষয়ে ভীষণ তৎপর হয়ে উঠলেন। আমি মূল বিষয়টি তাঁর সামনে উপস্থাপন করলাম এবং এই বিষয়ে তাঁর সহযোগিতা কামনা করলাম। তিনি বললেন, আমি পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র দেখেছি। এই লেখা পরীক্ষার হলে বসে সম্ভব নয়। আমি বললাম, আমি পরীক্ষার্থীকে সাথে নিয়ে এসেছি এবং যেই কলম দিয়ে লিখেছে সেটিও নিয়ে আসা হয়েছে।
তিনি অনুমতি দিলে আমি তাকে প্রিন্সিপাল সাহেবের কক্ষে ডেকে নিলাম। এর পর প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, তুমি যেই কলম দিয়ে পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিয়েছ দশ মিনিটের মধ্যে সেই কলম দিয়ে আরবী ভাষায় তোমার ইচ্ছা মত এক পৃষ্ঠা লিখে জমা দাও। তা হলে আমি বুঝবো আসলেই তুমি পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিয়েছ কি না। আমার সেই কৃতি ছাত্র আবদুর রহীম বুখারী পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার উত্তরপত্র জমা দেয়। প্রিন্সিপাল মাওলানা কামাল উদ্দীন খান সাহেব উত্তরপত্র দেখে ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো। আমি বিস্মিত হয়ে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি কোন উত্তর দিলেন না। বরং সেটি আবদুর রহীম বুখারীর হাতে তুলে দিয়ে তা পড়ে শোনাতে বলেন। আবদুর রহীম বুখারী সুরেলা কন্ঠে তা পড়তে লাগলো। মূলত এটি ছিল একটি আরবী কাসীদা যা সে রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা, প্রিন্সিপাল মাওলানা কামাল উদ্দীন খান ও এখানকার একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে রচনা করেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সন্দেহ বশত পূর্বে প্রদত্ত রিপোর্টে তার মোট প্রাপ্ত নম্বর হতে দশ নম্বর কর্তন করা হয় যা পুনর্বিবেচনার কোন সুযোগ নাই। চুনতী মাদ্রাসার ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে তিনি ভালো ভাবেই জ্ঞাত আছেন। কিন্তু পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল সুফিয়া মাদ্রাসা। তাই তাঁর বুঝার কোন সুযোগ ছিল না যে সে চুনতী মাদ্রাসার ছাত্র। যাই হোক, তাঁর বিশেষ অনুরোধে আমরা এক রাত সেখানে তাঁর অতিথি হিসাবে অবস্থান করি। পরদিন সকালে তাঁর একটি রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি ঢাকা চলে যাই এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহোদয়ের নিকট সেটি জমা দেই। ফলাফল প্রকাশিত হলো। মেধা তালিকায় তার স্থান চতুর্থ। দশ নম্বর কর্তন করা না হলে মেধা তালিকায় তার অবস্থান হতো প্রথম। কিন্তু যেহেতু আগেই মেধা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে আর আহমদ আলী চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে তাই আইনগত ঝামেলা এড়ানোর স্বার্থে এবং কাউকে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন না করার জন্য তাকে কেবল প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়। আর মাওলানা আবদুর রহীম বুখারীও এই ফলাফল মেনে নেয়।
মাওলানা আহমদ আলী তথা প্রফেসর ড. আহমদ আলীকে গারাঙ্গিয়া মাদ্রাসায় নিয়োগের জন্য নির্বাচনী বোর্ড ডাকা হয়। আমি বিশেষজ্ঞ সদস্য। আহমদ আলী আমার সাথেই ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য সেখানে গমন করে। কিন্তু আমি তাকে সেখানে নিয়োগ দেই নি। কারণ, আগেই আমি তাকে চুনতী মাদ্রাসায় বেসরকারীভাবে নিয়োগ দিয়ে রেখেছি। আর ইতোমধ্যে সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কারণে আইনগত সমস্যা এড়ানোর জন্যই আমি এটি করেছি। এর পরিবর্তে তারই সহপাঠী মাওলানা আবদুর রহীম বুখারীকে সেখানে নিয়োগ দেই।
গারাঙ্গিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় একটি সামাজিক সমস্যা হয়। মাওলানা আবদুর রহীম বুখারী আমার কাছে ছুটে আসে। আমি যথাসাধ্য তাকে পরামর্শ দেই। আমার পরামর্শ যথাযথ অনুসরণ করে সেই সমস্যা সমাধানে সে সমর্থ হয়।
মাওলানা আবদুর রহীম বুখারী খুবই মেধাবী কিন্তু কিছুটা অস্থির প্রকৃতির ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে দাওরা সম্পন্ন করার পর দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকেও সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে মুফতী মুহাম্মদ শফী কর্তক প্রতিষ্ঠিত করাচিস্থ নিউ টাউন মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করেন। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। তাঁর চলাফেরা দ্বারা তাঁর জ্ঞানের গভীরতা পরিমাপ করা কঠিন ছিল। তিনি হাস্য রস সৃষ্টি করে সব সময় পরিবেশকে হালকা রাখতে সচেষ্ট থাকতেন। বয়সে আমার চাইতে কয়েক বছরের বড় হলেও আমাকে আজীবন শিক্ষকের মর্যাদা দিয়ে সম্মান করেছেন। একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, হুজুর, আমার ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী। আমি বললাম, আপনি আর পারদের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তিনি বললেন, যেমন? আমি বললাম, পারদ যেমন স্থির থাকতে পারে না, অনুরূপ আপনিও এক জায়গায় স্থির থাকতে পারেন না। তিনি আমার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন।
১৯৮৯ সালে চুনতী মাদ্রাসার বার্ষিক সভায় আমি মাওলানা আবদুর রহীম বুখারীকে বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানাই। তিনি আসেন এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার উপর বলতে গিয়ে মাহফিলে প্রকাশ্যে দান করে মারহাবা বলার উপর দলীল প্রমাণ উপস্থাপন করেন। আমি তাঁকে কিছু হাদিয়া দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেন নি, বরং নিজের পক্ষ থেকে মাদ্রাসার জন্য কিছু দান করে যান।
গত ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে তাঁর সাথে আমার টেলিফোনে কথা হয়। তিনি আমার সাথে দেখা করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। কিন্তু আমি অনেক দিন কাতার ও তুরস্ক সফরে থাকার কারণে এবং কিছুদিন অপারেশন পরবর্তী বিশ্রামে থাকার কারণে আর দেখা হয়নি। গতকাল খবর পেলাম তিনি আর বেঁচে নেই। মহান রাব্বুল আলামীনের আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি পরপারে চলে গেছেন। এর মাধ্যমে একজন অসাধারণ মেধাবী আলিমে দ্বীনের মৃত্যু হলো। আমি তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া করছি, যেন তিনি মাওলানা আবদুর রহীম বুখারীর জীবনের সকল খেদমত ও সকল নেক আমল কবুল করেন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here